গল্প: কোরবানি | বাংলা গল্প ২০২০

গল্প: কোরবানি

শ্বশুরের চাপ আর বউয়ের পিড়াপীড়িতে অনিচ্ছা সত্বেও
গেলাম গরু কিনতে। শ্বশুর আমার অবসরপ্রাপ্ত সরকারী
কর্মকর্তা। শ্বশুর মশাই আমার কাধে হাত রেখে
বললেন,বুঝলে বাবাজী আজ একটা মস্ত বড় গরু কিনবো।
প্রতিবছর কোরবানীর গরু আমি না দেখেই লোক দিয়ে
কিনে নিয়ে আসি। কিন্তু আজ তুমি আছো, আমার আর
বাজারে আসতে সমস্যা নেই। জ্বী বাবা জ্বী।
সারা বাজার ঘুরে শেষমেষ একটা গরু পছন্দ করলাম।
একটা মোটাসোটা গরু নিয়ে ৬-৭ বছর বয়সী এক মেয়ে আর
তার বাবা দাড়িয়ে আছে। বাবা এই গরুটা ভালো হবে।
গরুর মালিক দাম দিয়ে বসলেন দেড় লাখ। শ্বশুর ভ্রু কুচকে
বললেন,,দেড় লাখ!! বড্ড বেশি। আমি এক লাখ দিতে
পারবো। ওদিকে দরকষাকষি চলছে। আর আমি ভিন্ন কিছু
দেখছি। ৬-৭ বছর বয়সী মেয়েটা গরুটার গলা জড়িয়ে ধরে
আছে। রিতীমত এই গরু দেখে ভয় পাওয়ার কথা। কিন্তু
দেখে মনে হচ্ছে ওর চিরচেনা স্বজন। যুগযুগের চেনা।
পরিশেষে শ্বশুর মশাই এক লাখ বিশ হাজার টাকায় গরুটা
কিনে নিলেন। সাথে একজন লোক আছে গরু নেওয়ার জন্য।
টাকা পরিশোধ করে গরুটা নিতে যাব এমন সময় মেয়েটা
গরুটার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগলো। সে
কান্না সমস্ত বাজারের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে যেতে
লাগলো। আশ্চার্য গরুটার চোখ দিয়েও অনর্গল জল
গড়িয়ে পড়ছে। কেউ কাউকে ছাড়তে চাইছেনা আমি এই
দৃশ্য সহ্য করতে পারছিনা। মেয়েটার বাবা কান্না
মিশ্রিত কন্ঠে বলে,,বুঝলেন সাব গরুডা আর মাইয়া দুইডা
এক লগে বড় হইছে তো! মায়া কাটোন পারেনা। এই বলে
মেয়েটাকে আর গরুটাকে আলাদা করার চেষ্টা করলেন।
আমি শ্বশুরের দিকে কয়েকবার তাকালাম। কেমন যেন
অন্যমনস্ক তিনি। এইরকম চেহারায় শ্বশুরকে কখনও
দেখিনি। গরু নিয়ে রওনা দিয়েছি।মেয়েটা বার বার
পেছনে তাকাচ্ছে আর বিলাপ করছে। শ্বশুর সাহেব হঠাৎ
থেমে গেলেন। ধীর পায়ে মেয়েটার কাছে গেলেন।
চোখের জল মুছে বুকে তুলে নিলেন। এটা তোমার গরু
মামনী? মেয়েটি মাথা নেড়ে জানালো এটা তার
গরু,,এটা তার ভালবাসা, মায়া, মমতা। অভাব,দৈন্যতার
কাছে ভালবাসা হেরে যায়। মায়া হয়ে যায় তুচ্ছ। শ্বশুর
মশাই গরুর দড়িটা মেয়েটির হাতে তুলে দিয়ে
বললেন,,যাও মামনী আজ থেকে এটা তোমারই গরু।
বাড়িতে নিয়ে গিয়ে অনেক খেতে দিবা। দেখছো কেমন
শুকিয়ে গেছে। মেয়েটি এক লাফ দিয়ে গরুটার গলা
জড়িয়ে ধরলো।মেয়েটির বাবা কিছু বলতে যাবে এমন
সময় শ্বশুর মশাই বললেন,,উহু কোন কথা নয়। টাকা
তোমাকে দেওয়া লাগবেনা। মনে করো ঐ টাকা দিয়ে
আমি ভালবাসা কিনলাম। আমি শ্বশুর মশাইয়ের কথা শুনে
অবাক হই। কিপটা বুইড়া কয় কি! এই সোহান। জ্বী বাবা।
চলো অন্য একটা গরু দেখি। চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি
তার চোখে জল। বাবা আপনি এমনটা কেন করলেন। ঐ
গরুটা তো অন্য কোথায়ও বিক্রিও করে দিবে আজ না হয়
কাল। তুমি বোঝনা সোহান। ঐ যে বললাম ভালবাসা
কিনলাম। এক মুহুর্তের জন্য বাচ্চাটা হেসেছে। আমার
এতেই অনেক। সবাই কষ্ট মেনে নিতে পারে কিন্তু সহ্য
করতে পারেনা। আমার চোখেও ফোটা ফোটা জল
জমেছে। আচ্ছা সোহান,আমরা লাখ টাকার গরু কিনে
কোরবানী করি ঠিকই কিন্তু যে পশুটা কোরবানি করি
তার প্রতি আমাদের মায়া মমতা কতখানি!! এক কোটি পশু
কোরবানি দিয়েও কি ঐ বাচ্চাটার ভালবাসার মুল্য হবে?
কোরবানি আমরা দেব কি! সে তো পদে পদে ভালবাসা
কোরবানি দিয়েছে। এদের সংখ্যা কিন্তু লাখ লাখ।
আমি শ্বশুর মশাইয়ের কথায় অবাক হই। তাইতো এসব তো
ভাবিনি। শ্বশুর মশাই কাধে হাত রেখে বললেন,,বুঝেছ
সোহান আজ যদি গরু কিনতে না পারি তবে তোমার
শ্বাশুরীকে বলবো আজ গরু নয় ভালবাসা কিনে এনেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *