দারুণ বাংলা ভালোবাসার গল্প না পরলে মিস

গল্প:- তবুও তুমি

মাহিন আর তানু একটা রেস্টুরেন্ট এ বসে কফি খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিলো। হুট করেই অনিক খুব জুড়ে তানু কে চড় মেরে বসে(ঠাসসসসস)। তানু গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে অনিকের দিকে তাকিয়ে আছে। বুঝে উঠার চেষ্টা করছে সত্যি কি অনিক ওকে চড় মারলো নাকি এটা তানুর ভুল ধারণা। না এটা ভুল না। অনিক নিজেই তানুর গালে চড়টা মারে। তানুর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। তবুও একটা কথাও বলছে না।
অনিকঃছিঃ তানু তুমি এতোটা খারাপ মনের মানুষ আমার জানা ছিলো না। আজ যদি অফিসের কাজে এখানে না আসতাম তাহলে তো তোমার জঘন্য চেহারাটা দেখতে পারতাম না। তুমি কি এতোটাই নিচে নামলে যে একটা ছেলের সাথে বসে রেস্টুরেন্ট এ দেখা করতে চলে এলে তাও আবার আমাকে না জানিয়ে। আমি কি কখনো তোমাকে তোমার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করেছি। কই কোনোদিন ও তো তোমাকে বাধা দেই নি তোমার কোনো কাজে। তাহলে আজ কেনো আমার চোখের আড়ালে তুমি রেস্টুরেন্টে এসে অন্য একটা ছেলের সাথে দেখা করবে। হাসাহাসি করবে। একসাথে বসে কফি খাবে। ছিঃ তানু ছিঃ আমার ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে যে এতোদিন আমি তোমাকে ভালোবেসে গেছি আর তুমি আমার সাথে অভিনয় করে গেছো। বাহহহ (এইবলে অনিক হাততালি দিতে থাকে)
তানুঃ অনিক তুমি আমার গায়ে হাত…….
অনিকঃ তুললাম। ইনফ্যাক্ট তুলতে বাধ্য হলাম। তুমি যে ঠিক। কতোটা খারাপ মনের মানুষ সেটা আমার বুঝা হয়ে গেছে।
তানুঃ কি বললে তুমি আমি খারাপ?
অনিকঃ তা নয়তো কি? যে মেয়ের স্বামী থাকতে অন্য একটা ছেলের সাথে কফি খেতে পারে। রেস্টুরেন্টে বসে গল্প করতে পারে সেই মেয়ে আর যাই হোক কখনো ভালো হতে পারে না।
তানুঃ জাস্ট শাট-আপ অনিক। অনেক বলেছো আর না। আমার তোমায় চিনতে ভুল হয়েছিলো। এতোদিন কি আমি এই অনিক কে ভালোবেসে গেছি সেটা ভাবতেই আমার নিজের উপর ঘৃণা হচ্ছে। তোমার মনমানসিকতা এক্কেবারে খারাপ হয়ে গেছে নয়তো তুমি এমন কথা মুখেও আনতে না।
অনিকঃ চুপ করো তো। আমার এসব ফালতু কথা বলে আমার মন গলাতে এসো না। আমি বাসায় গিয়ে যেন তোমাকে না দেখি।
তানুঃ অনিক…………
অনিক আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে অফিসে চলে যায়।
তানু ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে। একহাত দিয়ে অন্যহাতের কনুই চেপে ধরে কান্না করতে থাকে। রেস্টুরেন্ট এর সবাই এতক্ষণ ওদের এই কাণ্ড দেখছিলো। কিছু লোক কানাঘুষা শুরু করে।
আজকাল কার ছেলেমেয়েরা এমনই হয়। বাবা মায়ের কথায় অবাধ্য হয়ে প্রেমিক/ প্রেমিকাকে ছেড়ে বাবা মায়ের পছন্দ করা মানুষ কে বিয়ে করে। বিয়ের পরেও ঠিকই এরা তাদের এক্সের সাথে মেলামেশা করে এদের যে কোথায় ঠাই হবে কে জানে।
তানু এইসব কথা কানেও নিচ্ছে না। অনিকের কথাগুলো বার বার কানে বাজছে। এই কি সেই অনিক যে আমাকে পেয়ে বলেছিলো পৃথিবীর সবচাইতে দামী জিনিসটা পেয়েছে। মুহুর্তেই আজ সব কিছু কেমন যেন হয়ে গেলো। মাহিন কথাগুলো শুনে রাগে ওইলোক গুলোকে ধমক দিয়ে বলে।
মাহিনঃ স্টপ দিস ননসেন্স। এইসব উল্টা পাল্টা কথা আপনাদের মতো কিছু নিচু মনের মানুষ এর মুখে মানায়। একটা ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে আর আপনারা শুরু করে দিলেন। আপনাদের কি আর কোনো কাজ নেই।
তানুঃ মাহিন প্লিজ তুমি আর কিছু বলতে যেও না। ওনাদের কোনো দোষ নেই। দোষ তো আমার অনিক ঠিকই বলেছে আমি খারাপ খুব খারাপ।
তানু নিজের ফোন আর পার্টস টা হাতে নিয়ে এক ছুটে রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে গেলো।
কোথায় যাচ্ছে জানে না শুধু এটাই জানে আজ থেকে আর ওই বাড়িতে পা রাখবে না। যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে থাকাটা ওর পক্ষে সম্ভব না। পাগলের মতো ছুটছে। সামনে কি সেদিকে কোনো খেয়াল নেই মেয়েটার। পাগলের মতো ছুটেই যাচ্ছে। এদিকে মাহিন পিছন থেকে অনেকবার ডাক দিলেও মাহিনের ডাকে পিছন ফিরে তাকায়নি তানু।
ছুটতে ছুটতে একটা সময় একটা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা খায়। ছিটকে পড়ে রাস্তার পাশে। গাড়ির মালিক আর কেউ না তানুর বেষ্ট ফ্রেন্ড নেহা। গাড়ি থেকে নেমে নেহা ওকে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়ে। কেনো তানু এভাবে ছুটছিলো মনে হাজারো প্রশ্ন ঘিরে ধরে নেহাকে। দেরী না করে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ভাগ্য ভালো তেমন কিছু হয়নি হাতের কিছু জায়গায় ছিলে গেছে আর মাথায় আঘাত পেয়ে অল্প জায়গা ফেটে গেছে। জ্ঞান ফিরার পর নেহা জানতে চাইলে তানু প্রথমে কিছু বলতে চায়নি। কিন্তু নেহার জুড়ের কাছে হার মেনে সব সত্য বলে দেয়। আর এটাও বলে যে আজ থেকে অনিকের কাছে যাবে না।
নেহাঃ তুই মরতে চেয়েছিলি।
তানুঃ আর কোনো উপায় নেই? কোথায় যেতাম আমি? কে আছে আমার? ছিলো তো একজন।সে নিজেই বলে দিলো যেন আমি ওই বাড়িতে পা না রাখি। আমার মুখ ও আর দেখতে চায় না।
নেহাঃ তাই বলে এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নিবি তুই।
তানুঃ পারলাম কই। তুই কেনো বাঁচালি আমাকে? কেনো মরতে দিলি না?
নেহাঃ পাগলামি রাখ তো। তুই ওকে সবটা বুঝিয়ে বলিস নি কেনো?
তানুঃ বলার সুযোগ টা দিলে তো বলতাম। তার আগেই তো নিজের মনে যা আসলো বলে দিলো। একবার জানতেও চাইলো না। আসল কারণ টা কি?
নেহাঃ কোথায় যাবি ভাবলি কিছু ওখানে তো যাবি না?
তানুঃ জানিনা।
নেহাঃ জানতে হবে না চল আয়। আমার সাথে আমার বাসায় যাবি। দেখি আমি কিছু করতে পারি কি না?
তানুঃ কি করবি তুই?
নেহাঃ কি করবো সেটা তোকে পরে বলি। এখন আপাতত আমার এখানে চল। বিকেল তো হয়ে গেলো।
তানুর জবাবের অপেক্ষা না করে নেহা ওকে বেড থেকে দাড় করিয়ে ধরে ধরে গাড়িতে নিয়ে বসায়। তারপর নিজের বাসায় নিয়ে যায়। এরপর ওকে রেস্ট নিতে বলে কাকে যেন কল করে?
এদিকে আফরিন তখন থেকে বাসায় এসে তানুর ফোনে কল দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু বার বার ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। ফোন যে বন্ধ সেদিকে হয়তো তানুর নিজেরই খেয়াল নেই। আফরিন ভয়ে পড়ে যায়। সারাদিন ধরে মেয়েটা বাসায় আসেনি। কোথায় আছে না আছে কিছুই জানে না।কিভাবে খুঁজে বের করবে তাও জানেনা।
দিন পেরিয়ে সন্ধ্যে হতেই অনিক অফিস থেকে বাসায় আসে। প্রতিদিন অনিক আসা মাত্রই তানু শাড়ির আচল দিয়ে ওর ঘাম মুছে দিতো। কিন্তু আজ আফরিন দরজা খুলে অনিক প্রথমে একটু অবাক হয়। পরক্ষণেই সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে পড়ে যায়। আফরিন কিছু বলতে যাবে সেটা না শুনেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়।
অনেকটা সময় একা একা পার করে দেয় অনিক। অন্যদিন হলে তানুর কোলে মাথা রেখে গল্প করতো দুজনে। ওদের বিয়ে হয়েছে প্রায় ৭ মাসের মতো হবে এ পর্যন্ত একটা দিন ওরা দুজন দুজনের থেকে আলাদা হয়নি আর আজ কোথা থেকে কি হয়ে গেলো এসব ভাবতে ভাবতেই অনিকের চোখ জলে ভরতি হয়ে গেলো।
আফরিন এসে খাবার খাওয়ার জন্য ডাক দেয়। কিন্তু অনিক খাবে না বলে ঘুমিয়ে থাকার ভান ধরে অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আফরিন এসে ওর পাশে দাঁড়ায়।
আফরিনঃ ভাইয়া আজ তুই জানিস তুই কতো বড় একটা ভুল করলি?
আফরিনের কথা পাশ ফিরে তাকায় অনিক।
অনিকঃ মানে কি বলছিস তুই?
আফরিনঃ ভাইয়া সেই সকালের পর থেকে ভাবির ফোনে ট্রাই করেই যাচ্ছি কিন্তু ফোন বার বার বন্ধ বলছে। ভাবি ঠিক আছে তো। আমার খুব ভয় করছে ভাইয়া। তুই আর আমি ছাড়া ভাবির আর কেউ নেই ভাইয়া আর সেই তুই আজ ভাবিকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বললি। তুই এতো পাষাণ হলি কিভাবে?
অনিকঃ আমি যা করেছ ঠিক করেছি।
আফরিনঃ ছি ভাইয়া তোর একথা মুখে আনতে লজ্জা করে না। তুই নিজেই একদিন ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলি। ইনফ্যাক্ট তুই এটা ও জানিস যে ওর বেবি হবে না। তার পরেও ওকে তুই নিজের ভালোবাসা দিয়ে সব সুখ এনে দিয়েছিলি। আজ একটা ভুল দেখা তোদের মাঝে কতোটা দুরত্ব এনে দিলো।
অনিকঃ আমি কোনো ভুল করেনি। এতোদিন আমি ভুল ছিলাম আর হ্যা তুই এতো কিছু কিভাবে জানলি?
আফরিনঃ ভাইয়া তুই জানিস আজ ভাবির সাথে যে ছেলেটা ছিলো সে কে? তোর কি একবার ও মনে হয়নি যে ছেলেটার সাথে ভাবির কি সম্পর্ক সেটা খুঁজে দেখার। তোর কি একবার ও মনে হয় নি যে তানু তোর জন্য নিজের জীবন টা দিয়ে দিতে পিচ পা হাটে না সে কিভাবে তোকে ঠকাতে পারে।
অনিকঃ মানে কি বলছিস তুই?
আফরিনঃ ভাইয়া আজ ভাবি একা রেস্টুরেন্ট এ ছিলো না। সাথে আমিও ছিলাম। আর যে ছেলেটা ছিলো সে মাহিন। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি।
অনিকঃ ওয়াট। তুই ওই ছেলেটাকে ভালোবাসিস।
আফরিনঃ হ্যা ভাইয়া। আর সেটা ভাবি কিভাবে যেন জেনে যায়। পরশু রাতে আমাদের মাঝে ঝগড়া হয় আর ভাবি সেই ঝগড়া মিটাতে ওকে রেস্টুরেন্ট এ ডাকে। মাহিন আমাকে বিয়ে করতে চায় কিন্তু ভাবি তোমাকে না জানিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। তাই মাহিন কে বুঝাতে রেস্টুরেন্ট দেখা করা।
অনিকঃ আমি যখন ওখানে ছিলাম তখন তো তোকে দেখিনি। কোথায় ছিলি তুই?
আফরিনঃ কফি খেতে খেতে হঠাৎ হাত ফসকে কফিটা আমার ড্রেসে পড়ে যায়। সেটা ধুতে আমি ওয়াশরুম এ যাই। ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই দেখি মাহিন ভাবিকে পিছন থেকে ডাকছে। আর ভাবি কোনো কথা না শুনে পাগলের মতো ছুটে গেছে। পরে মাহিনকে জিজ্ঞেস করে সব টা জানলাম। তখন থেকে ভাবির ফোনে কল দিয়েই যাচ্ছি ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। তোর কি মনে হয় না তোর একটা ভুলের জন্য আজ ওকে হারাতে হলো। ভাবির কিছু হলে তার জন্য দায়ী থাকবি তুই ভাইয়া। শুধু তুই।
অনিক ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে। এতোদিন এ ওর কি তানুকে চিনতে কোথাও ভুল ছিলো। কোথায় খুঁজবে এখন ওকে। এদিকে রাত অনেক হয়েছে। সারাদিন মেয়েটা কোথায় কাটালো কিভাবে কাটালো এসব এসব ভাবতে ভাবতেই নিজের উপর রাগ টা বাড়তেই থাকে।
অনিক তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবে তখনই আফরিন ওকে বলে।
আফরিনঃ কোথায় যাচ্ছিস?
অনিকঃ ভুলটা শোধরাতে।
আফরিনঃ কোথায় খুঁজবি ভাবিকে এতো রাতে।
অনিকঃ আমি কিচ্ছু জানিনা শুধু এটাই জানি ওকে আমার চাই। যেভাবে হোক খুঁজে বের করতে হবে।
অনেকটা সময় খুঁজবার পর অনিক ব্যর্থ হয়ে গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে রাখে। মনে মনে নিজেকে হাজারো গালিগালাজ করছে।
কিভাবে পারলাম আমি ওকে ভুল বুঝতে। যে মেয়েটা আমার জন্য নিজেকে নতুন ভাবে বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ আমি কিনা তাকে আবারো বাধ্য করলাম সেই ভুলটা করতে যে ভুল একবছর আগে করতে যাচ্ছিলো।
বছর খানেক আগে অনিক যখন গাড়ি নিয়ে বাসায় ফিরছিলো তখন হঠাৎ ওর গাড়িটা তেল ফুরিয়ে যায়। মাঝরাস্তায় বসে বসে ভাবছে বাসায় যাবে কিভাবে? তখন কারো কান্নার আওয়াজ কানে আসে। চারিদিকে তাকিয়ে দেখে রাস্তায় পাশে একটা মেয়ে কান্না করছে। অনিক তার কাছে যাওয়ার আগেই মেয়েটা মাঝরাস্তায় চলে আসে। তখন উল্টো দিক থেকে একটা বাস ওকে ধাক্কা দিতে যাবে এমন সময় অনিক মেয়েটাকে একটা টান দিয়ে রাস্তায় কিনারায় গিয়ে পড়ে।
জানতে চাইলে মেয়েটা প্রথমে কিছুই বলে না।
অনেক জুর করে তারপর মেয়েটা বলা শুরু করে।
অনিকঃ দেখুন এতো রাতে কেউ তো আর এমনি এমনি মরতে আসে না। আপনার মরতে যাওয়ার ইচ্ছাটা জাগলো কেনো?
তানুঃ…………
অনিকঃ প্লিজ বলুন আমাকে আপনার বন্ধু ভাবতে পারেন আমি কোনো ক্ষতি করবো না।
তানুঃ………….
অনিকঃ বিশ্বাস রাখতে পারেন আমার উপর।
তানুঃ বিশ্বাস আর কতো বিশ্বাস করে ঠকবো। নিজেকে আর কতো ঠকাবো। পারছি না আর এই যন্ত্রণা সহ্য করতে। বাধ্য হয়ে মরার পথ বেচে নিলাম। কেনো বাচালেন আপনি আমাকে।
অনিকঃ আমাকে বুঝিয়ে না বললে বুঝবো কিভাবে?
তানুঃ জন্মের পরেই বাবা মা একটা এক্সিডেন্ট এ মারা যায়। মামা মামির কাছে মানুষ হলাম। সেই মামাই এখন সম্পত্তির জন্য তার গুন্ডা বদমাশ ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিতে চায়। অনেক বাধা দেই কাজ হয় না। বাধ্য হয়ে সব সম্পত্তি এতিমখানায় দান করি। পরিচিত বলতে নেহা নামে একটা ফ্রেন্ড আছে সে আজ দেশের বাইরে। নইলে ওর কাছেই যেতাম। মামা মামির কাছে গেলাম সম্পত্তি নেই বলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলো। যাওয়ার মতো আর কোনো আশ্রয় স্থল নেই। বাধ্য হয়ে নিজেকে শেষ করে দিতে…….
অনিকঃ হা হা হা। আপনি কি পাগল নাকি। এটা কোনো কারণ হলো মরার মতো।
তানুঃ শুধু এটা না।আরো একটা কারণ আছে।
অনিকঃ কি সেটা?(হাসি থামিয়ে)
তানুঃ আমার মতো অপয়া মেয়েকে কেউ বিয়ে করবে না। মামা মামি তো সম্পত্তির জন্য আমাকে ব্যবহার করে দুদিন পর রাস্তায় ফেলে দিতো। আর তারপরেও আমাকে এই মৃত্যুর আশ্রয় নিতে হতো।
অনিকঃ মরতে হবেই কেনো?
তানুঃ আমি কোনোদিন ও বেবি নিয়ে পারবো। এই একটা কারনে সবাই আমাকে অপয়া বলে। এই অপবাদ টা মেনে নেওয়ার মতো শক্তি ইচ্ছে আর আগ্রহ কিছুই আমার নেই।
অনিকঃ আপনি তো বড্ড বোকা। আজ কাল এটা কোনো কারণ না। বেবি হবে বেবি এডপ্ট নিলেই হয়। আর এটা কি আপনি ইচ্ছে করে করেছেন এটা বিধাতার স্বয়ং নিজে লিখে রেখেছেন তাই আপনার কপালে মাতৃত্ব এর সুখ নেই তাই বলে মা ডাক শুনতে পারবেন না এমন তো না। বিয়ের পর বেবি এডোপ্ট নিলেই হয়ে যাবে।
তানুঃ ঘর বাড়ি আত্মীয় স্বজন কেউ নেই। রাস্তায় পরে থাকা মেয়ে কে কে বিয়ে করবে।
অনিক ভাবনায় পরে যায়। অনেক ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নেয় যে সে তানুকে বিয়ে করবে। অনেক কষ্টে মুখ থেকে কথাটা বের করে অনিক।
অনিকঃ যদি বলি আমি। তাহলে কি ফিরিয়ে দিবেন আমাকে?
তানুঃ হি হি হি। হাসালেন আমাকে। দয়া দেখাচ্ছেন আমার উপর করুণা করছেন আমি কারো করুণা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।
অনিকঃ করুণা কেনো হবে মানুষ হিসেবে একটা মানুষ কে বাঁচাতে চাইছি। আর আপনার সেটা করুণা মনে হয়।
তানুঃ তা নয়তো কি? আর আপনি বললে কি হবে আপনার পরিবার। আপনার মা বাবা।
অনিকঃ আফরিন নামে একটা বোন ছাড়া কেউ নেই। আর আজ আপনি আমার সাথেই যাচ্ছেন।
তানুঃ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
অনিকঃ বিশ্বাস রাখতে পারো যতদিন না তুমি আমাকে মেনে নিবে ততদিন আমরা বিয়ে করবো না।
তানুঃ মানে মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আমি কোথায় থাকবো?
অনিকঃ গার্লস হোস্টেলে। আপনার সব দায়িত্ব আজ থেকে আমার আর হ্যা আমি জানি আমি ওতোটা খারাপ নই যে আমাকে মেনে নিতে খুব বেশি সময় লাগবে।
তানুঃ যে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দেয় তাকে অবিশ্বাস করাটা অন্যায়।
অনিকঃ তাহলে যাচ্ছেন আমার সাথে।
তানুঃ একটা শর্ত।
অনিকঃ কি?
তানুঃআমাকে তুমি করে বলবেন।
অনিকঃ ওকে মিস
তানুঃ তামান্না রাহাত তানু।
এইভাবেই অনিক আর তানুর পরিচয়। একটা সময় দুজনের ভালোলাগা তারপর ভালোবাসা আর অবশেষে বিয়ে। অনিকের ভাবনা থামে ফোনের রিংটোন এ।
অনিকঃ হ্যা নেহা বলো।
নেহাঃ বলবে তো তুমি ভাইয়া। এক্ষুণি আমার বাসায় আসো।
অনিকঃ এখন যেতে পারবো না নেহা একটা ভুল করে ফেলেছি যেভাবে হোক আজ এই ভুলটা শুধরাতে হবে।
নেহাঃ এভাবে মাঝরাস্তায় থাকলে জীবনেও শুধরাতে পারবে না।আমার বাসায় আসো তাড়াতাড়ি।
অনিকঃ তারমানে তানু ওখানে আছে।
নেহাঃ হ্যা আমার কাছে আছে।
অনিকঃ আমি এক্ষুণি আসছি।
অনিক একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয় তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে নেহার বাসার দিকে রওয়ানা দেয়।
কলিংবেল বাজাতেই নেহা দরজা খুলে দেয়।
অনিকঃ কোথায় তানু?
নেহাঃ আর কোথায় রুমে। সেই তখন থেকে কেঁদেই যাচ্ছে।
অনিকঃ আমি কেনো যে এমনটা করলাম? এখন নিজের চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে।
নেহাঃ সেটা তানু নিজেই ছিড়ে দিবে আগে ওর কাছে যাও।
অনিক তাড়াতাড়ি ভেতরে গিয়ে একটা রুমে ডুকে। ভেতরে ডুকে দেখে তানু বালিশে মাথা হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। এদিকে চোখের জল অবিরত ঝড়ছে। তানুর হাতের উপর ব্যান্ডেজ দেখে অনিকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। ভালো করে তাকিয়ে দেখে মাথায় ও একটা ব্যান্ডেজ। অনিক ওর পাশে গিয়ে বসে। তানুর একটা হাত নিজের হাতে নেয়। ব্যথার জায়গায় আলতো করে চুমু খায়। তানুর বুঝতে বাকি নেই এটা অনিক। অনিকের ছোঁয়া ভালো করেই অনুভব করতে পারে। চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। ঘুমের অভিনয় করে চোখ বন্ধ করে আছে। তানু চোখ খুলে তাকাচ্ছে না দেখে অনিক নিজেই মুখ খুলে।
অনিকঃ আমি জানি পাগলি তুমি ঘুমাওনি। শুধু শুধু ঘুমের অভিনয় কেনো করছো? তুমি খুব ভালো করেই জানো আমার বুকে মাথা না রেখে তুমি ঘুমাতে পারো না। তোমাকে বুকে না নিয়ে ঘুমালে আমার নিজেরও ঘুম আসে না।
তানুঃ……….
অনিকঃ তোমার অনিক তোমাকে ডাকছে তুমি শুনবে না তার কথা। মাথা রাখবে না তার বুকে। কি হলো তানু কিছু বলছো না কেনো? আমি জানি তুমি ঘুমাও নি। তুমি ঘুমের ভান ধরেই আছো। প্লিজ একবার তাকাও না।
তানুঃ…………
তানু কোনো সাড়া দিচ্ছে না। অনিক নিজে থেকেই তানুর মাথায় নিজের দুহাত রাখে। অনিকের হাতের ছোঁয়ায় ব্যথা লাগলেও চোখ তুলে তাকাচ্ছে না মেয়েটা। অনিক ওর মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে। অনিক জানে এখন আর কথা না বলে থাকতে পারবে না। খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।
অনিকঃ ভুল হয়ে গেছে আমার ক্ষমা করে দাও।
অনিক কথাটা বলা মাত্রই তানু নিজের দুহাত দিয়ে অনিককে আরো জুড়ে চেপে ধরে কান্নার বেগ বাড়িয়ে দেয়।
অনিকঃ আমি নিজেই তোমাকে বেঁচে থাকার জন্য সাহস যোগাই আর আমি কি না তোমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলাম। আমার একটা ভুলের জন্য কতো কষ্ট পেতে হলো তোমাকে। কিভাবে পারলাম আমি এমনটা করতে? কিভাবে তোমাকে ভুল বুঝলাম আমি? আমাকে ক্ষমা করে দেও তানু। আমি জানি আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। তোমাকে ওই ভাবে বলতে চাইনি। কি করবো বলো মাহিনকে ওখানে দেখে মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিলো। তোমাকে হারিয়ে ফেললে আমি বাঁচবো কিভাবে?
তানুঃ এইভাবে বলো না অনিক খুব কষ্ট হয়।
অনিকঃ ক্ষমা করে দাও।
তানুঃ আমার এই জীবনটা তো তোমারই দেওয়া অনিক। যদি সেদিন তুমি আমাকে না বাঁচাতে তাহলে আজ হয়তো আমি এইভাবে তোমার বুকে থাকতাম না।
অনিকঃ সেদিনের মতো ভুলটা আবার করতে চাইছিলে।
তানুঃ তুমি ছাড়া যে আমার কেউ নেই অনিক। সেই তুমি যখন আমাকে তোমার থেকে দূরে সরে যেতে বললে বিশ্বাস করো আমার মাথায় তখন শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছিলো নিজেকে শেষ করে দিবো। বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তুমি। আর আজ তোমার থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে এটা ভাবলেই মরে যেতে ইচ্ছে করে।
অনিকঃ আর কোনদিন ও এমন হবে না। এবারের মতো ক্ষমা করো।(তানুর দু গালে হাত রেখে)
তানুঃ একটা শর্তে ক্ষমা পাবে।
অনিকঃ বলো কি শর্ত সব মানতে রাজি।
এইবলে অনিক তানুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। তানু ওর মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর বলছে..
তানুঃ মাহিন আর আফরিনের বিয়েটা দিলে কেমন হয়? না মানে যদি তুমি রাজি থাকো তো আমি চাই আগামী মাসেই ওদের কে…..
অনিকের বড় বড় করে তাকিয়ে থাকা দেখে তানু ভয় পেয়ে ডোক গিলে। তারপর ভয়ে ভয়ে অনিকের দিকে তাকায়। অনিক ওর এই অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অনিকঃ এইভাবে তাকানোর কি আছে? আমি বাঘ ভাল্লুক কিছু না যে তোমাকে খেয়ে ফেলবো। আফরিন আমার থেকে বেশি তোমাকে ভালবাসে ভরসা করে আর আমি জানি তুমি ওর সাথে খারাপ কিছু হতে দিবে না। তুমি যেভাবে ওকে বুঝাচ্ছো এতে ও তোমার প্রতি আরো শ্রদ্ধাশীল হতে থাকে। আর তাই আমি চাই আফরিন এর জীবনের যত সিদ্ধান্ত সেটা তুমি আর আফরিন মিলে নিবে। আর ইচ্ছে হলে আমাকেও সাথে রাখতে পারো।
তানুঃ শয়তান,বানর,উল্লুক। আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম। কেউ এইভাবে তাকায়।
তানু ধুমধাম কিলঘুষি দিতে থাকে অনিকের বুকে। অনিক ওর হাতটা ধরে নেয়।
অনিকঃ বুকে ব্যথা দিচ্ছো কেনো? তুমি মাথা রাখবে কোথায় যদি বেশি ব্যথা লাগে।
তানুঃলাগবেনা। যত ব্যথা দেই তবুও তুমি আমারই।
তানু আলতো করে নিজের দুঠোট ছুঁইয়ে দিলো অনিকের বুকে। অনিক ওকে নিজের বুকে মিশিয়ে নিলো। দুজনেই যেন আজ ভালোবাসাকে নতুন ভাবে উপলব্ধি করছে।একে অপরের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে আজ অজানা খেয়ালে।
ভালো থাকুক ভালোবাসার মানুষ গুলো।ভালো রাখুক তাদের ভালোবাসাকে।
.
সমাপ্ত——।
.
.
গল্প:- তবুও তুমি,,,
লিখা:- আরিয়ান ইসলাম।মাহিন আর তানু একটা রেস্টুরেন্ট এ বসে কফি খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিলো। হুট করেই অনিক খুব জুড়ে তানু কে চড় মেরে বসে(ঠাসসসসস)। তানু গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে অনিকের দিকে তাকিয়ে আছে। বুঝে উঠার চেষ্টা করছে সত্যি কি অনিক ওকে চড় মারলো নাকি এটা তানুর ভুল ধারণা। না এটা ভুল না। অনিক নিজেই তানুর গালে চড়টা মারে। তানুর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। তবুও একটা কথাও বলছে না।
অনিকঃছিঃ তানু তুমি এতোটা খারাপ মনের মানুষ আমার জানা ছিলো না। আজ যদি অফিসের কাজে এখানে না আসতাম তাহলে তো তোমার জঘন্য চেহারাটা দেখতে পারতাম না। তুমি কি এতোটাই নিচে নামলে যে একটা ছেলের সাথে বসে রেস্টুরেন্ট এ দেখা করতে চলে এলে তাও আবার আমাকে না জানিয়ে। আমি কি কখনো তোমাকে তোমার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করেছি। কই কোনোদিন ও তো তোমাকে বাধা দেই নি তোমার কোনো কাজে। তাহলে আজ কেনো আমার চোখের আড়ালে তুমি রেস্টুরেন্টে এসে অন্য একটা ছেলের সাথে দেখা করবে। হাসাহাসি করবে। একসাথে বসে কফি খাবে। ছিঃ তানু ছিঃ আমার ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে যে এতোদিন আমি তোমাকে ভালোবেসে গেছি আর তুমি আমার সাথে অভিনয় করে গেছো। বাহহহ (এইবলে অনিক হাততালি দিতে থাকে)
তানুঃ অনিক তুমি আমার গায়ে হাত…….
অনিকঃ তুললাম। ইনফ্যাক্ট তুলতে বাধ্য হলাম। তুমি যে ঠিক। কতোটা খারাপ মনের মানুষ সেটা আমার বুঝা হয়ে গেছে।
তানুঃ কি বললে তুমি আমি খারাপ?
অনিকঃ তা নয়তো কি? যে মেয়ের স্বামী থাকতে অন্য একটা ছেলের সাথে কফি খেতে পারে। রেস্টুরেন্টে বসে গল্প করতে পারে সেই মেয়ে আর যাই হোক কখনো ভালো হতে পারে না।
তানুঃ জাস্ট শাট-আপ অনিক। অনেক বলেছো আর না। আমার তোমায় চিনতে ভুল হয়েছিলো। এতোদিন কি আমি এই অনিক কে ভালোবেসে গেছি সেটা ভাবতেই আমার নিজের উপর ঘৃণা হচ্ছে। তোমার মনমানসিকতা এক্কেবারে খারাপ হয়ে গেছে নয়তো তুমি এমন কথা মুখেও আনতে না।
অনিকঃ চুপ করো তো। আমার এসব ফালতু কথা বলে আমার মন গলাতে এসো না। আমি বাসায় গিয়ে যেন তোমাকে না দেখি।
তানুঃ অনিক…………
অনিক আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে অফিসে চলে যায়।
তানু ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে। একহাত দিয়ে অন্যহাতের কনুই চেপে ধরে কান্না করতে থাকে। রেস্টুরেন্ট এর সবাই এতক্ষণ ওদের এই কাণ্ড দেখছিলো। কিছু লোক কানাঘুষা শুরু করে।
আজকাল কার ছেলেমেয়েরা এমনই হয়। বাবা মায়ের কথায় অবাধ্য হয়ে প্রেমিক/ প্রেমিকাকে ছেড়ে বাবা মায়ের পছন্দ করা মানুষ কে বিয়ে করে। বিয়ের পরেও ঠিকই এরা তাদের এক্সের সাথে মেলামেশা করে এদের যে কোথায় ঠাই হবে কে জানে।
তানু এইসব কথা কানেও নিচ্ছে না। অনিকের কথাগুলো বার বার কানে বাজছে। এই কি সেই অনিক যে আমাকে পেয়ে বলেছিলো পৃথিবীর সবচাইতে দামী জিনিসটা পেয়েছে। মুহুর্তেই আজ সব কিছু কেমন যেন হয়ে গেলো। মাহিন কথাগুলো শুনে রাগে ওইলোক গুলোকে ধমক দিয়ে বলে।
মাহিনঃ স্টপ দিস ননসেন্স। এইসব উল্টা পাল্টা কথা আপনাদের মতো কিছু নিচু মনের মানুষ এর মুখে মানায়। একটা ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে আর আপনারা শুরু করে দিলেন। আপনাদের কি আর কোনো কাজ নেই।
তানুঃ মাহিন প্লিজ তুমি আর কিছু বলতে যেও না। ওনাদের কোনো দোষ নেই। দোষ তো আমার অনিক ঠিকই বলেছে আমি খারাপ খুব খারাপ।
তানু নিজের ফোন আর পার্টস টা হাতে নিয়ে এক ছুটে রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে গেলো।
কোথায় যাচ্ছে জানে না শুধু এটাই জানে আজ থেকে আর ওই বাড়িতে পা রাখবে না। যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে থাকাটা ওর পক্ষে সম্ভব না। পাগলের মতো ছুটছে। সামনে কি সেদিকে কোনো খেয়াল নেই মেয়েটার। পাগলের মতো ছুটেই যাচ্ছে। এদিকে মাহিন পিছন থেকে অনেকবার ডাক দিলেও মাহিনের ডাকে পিছন ফিরে তাকায়নি তানু।
ছুটতে ছুটতে একটা সময় একটা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা খায়। ছিটকে পড়ে রাস্তার পাশে। গাড়ির মালিক আর কেউ না তানুর বেষ্ট ফ্রেন্ড নেহা। গাড়ি থেকে নেমে নেহা ওকে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়ে। কেনো তানু এভাবে ছুটছিলো মনে হাজারো প্রশ্ন ঘিরে ধরে নেহাকে। দেরী না করে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ভাগ্য ভালো তেমন কিছু হয়নি হাতের কিছু জায়গায় ছিলে গেছে আর মাথায় আঘাত পেয়ে অল্প জায়গা ফেটে গেছে। জ্ঞান ফিরার পর নেহা জানতে চাইলে তানু প্রথমে কিছু বলতে চায়নি। কিন্তু নেহার জুড়ের কাছে হার মেনে সব সত্য বলে দেয়। আর এটাও বলে যে আজ থেকে অনিকের কাছে যাবে না।
নেহাঃ তুই মরতে চেয়েছিলি।
তানুঃ আর কোনো উপায় নেই? কোথায় যেতাম আমি? কে আছে আমার? ছিলো তো একজন।সে নিজেই বলে দিলো যেন আমি ওই বাড়িতে পা না রাখি। আমার মুখ ও আর দেখতে চায় না।
নেহাঃ তাই বলে এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নিবি তুই।
তানুঃ পারলাম কই। তুই কেনো বাঁচালি আমাকে? কেনো মরতে দিলি না?
নেহাঃ পাগলামি রাখ তো। তুই ওকে সবটা বুঝিয়ে বলিস নি কেনো?
তানুঃ বলার সুযোগ টা দিলে তো বলতাম। তার আগেই তো নিজের মনে যা আসলো বলে দিলো। একবার জানতেও চাইলো না। আসল কারণ টা কি?
নেহাঃ কোথায় যাবি ভাবলি কিছু ওখানে তো যাবি না?
তানুঃ জানিনা।
নেহাঃ জানতে হবে না চল আয়। আমার সাথে আমার বাসায় যাবি। দেখি আমি কিছু করতে পারি কি না?
তানুঃ কি করবি তুই?
নেহাঃ কি করবো সেটা তোকে পরে বলি। এখন আপাতত আমার এখানে চল। বিকেল তো হয়ে গেলো।
তানুর জবাবের অপেক্ষা না করে নেহা ওকে বেড থেকে দাড় করিয়ে ধরে ধরে গাড়িতে নিয়ে বসায়। তারপর নিজের বাসায় নিয়ে যায়। এরপর ওকে রেস্ট নিতে বলে কাকে যেন কল করে?
এদিকে আফরিন তখন থেকে বাসায় এসে তানুর ফোনে কল দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু বার বার ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। ফোন যে বন্ধ সেদিকে হয়তো তানুর নিজেরই খেয়াল নেই। আফরিন ভয়ে পড়ে যায়। সারাদিন ধরে মেয়েটা বাসায় আসেনি। কোথায় আছে না আছে কিছুই জানে না।কিভাবে খুঁজে বের করবে তাও জানেনা।
দিন পেরিয়ে সন্ধ্যে হতেই অনিক অফিস থেকে বাসায় আসে। প্রতিদিন অনিক আসা মাত্রই তানু শাড়ির আচল দিয়ে ওর ঘাম মুছে দিতো। কিন্তু আজ আফরিন দরজা খুলে অনিক প্রথমে একটু অবাক হয়। পরক্ষণেই সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে পড়ে যায়। আফরিন কিছু বলতে যাবে সেটা না শুনেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়।
অনেকটা সময় একা একা পার করে দেয় অনিক। অন্যদিন হলে তানুর কোলে মাথা রেখে গল্প করতো দুজনে। ওদের বিয়ে হয়েছে প্রায় ৭ মাসের মতো হবে এ পর্যন্ত একটা দিন ওরা দুজন দুজনের থেকে আলাদা হয়নি আর আজ কোথা থেকে কি হয়ে গেলো এসব ভাবতে ভাবতেই অনিকের চোখ জলে ভরতি হয়ে গেলো।
আফরিন এসে খাবার খাওয়ার জন্য ডাক দেয়। কিন্তু অনিক খাবে না বলে ঘুমিয়ে থাকার ভান ধরে অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আফরিন এসে ওর পাশে দাঁড়ায়।
আফরিনঃ ভাইয়া আজ তুই জানিস তুই কতো বড় একটা ভুল করলি?
আফরিনের কথা পাশ ফিরে তাকায় অনিক।
অনিকঃ মানে কি বলছিস তুই?
আফরিনঃ ভাইয়া সেই সকালের পর থেকে ভাবির ফোনে ট্রাই করেই যাচ্ছি কিন্তু ফোন বার বার বন্ধ বলছে। ভাবি ঠিক আছে তো। আমার খুব ভয় করছে ভাইয়া। তুই আর আমি ছাড়া ভাবির আর কেউ নেই ভাইয়া আর সেই তুই আজ ভাবিকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বললি। তুই এতো পাষাণ হলি কিভাবে?
অনিকঃ আমি যা করেছ ঠিক করেছি।
আফরিনঃ ছি ভাইয়া তোর একথা মুখে আনতে লজ্জা করে না। তুই নিজেই একদিন ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলি। ইনফ্যাক্ট তুই এটা ও জানিস যে ওর বেবি হবে না। তার পরেও ওকে তুই নিজের ভালোবাসা দিয়ে সব সুখ এনে দিয়েছিলি। আজ একটা ভুল দেখা তোদের মাঝে কতোটা দুরত্ব এনে দিলো।
অনিকঃ আমি কোনো ভুল করেনি। এতোদিন আমি ভুল ছিলাম আর হ্যা তুই এতো কিছু কিভাবে জানলি?
আফরিনঃ ভাইয়া তুই জানিস আজ ভাবির সাথে যে ছেলেটা ছিলো সে কে? তোর কি একবার ও মনে হয়নি যে ছেলেটার সাথে ভাবির কি সম্পর্ক সেটা খুঁজে দেখার। তোর কি একবার ও মনে হয় নি যে তানু তোর জন্য নিজের জীবন টা দিয়ে দিতে পিচ পা হাটে না সে কিভাবে তোকে ঠকাতে পারে।
অনিকঃ মানে কি বলছিস তুই?
আফরিনঃ ভাইয়া আজ ভাবি একা রেস্টুরেন্ট এ ছিলো না। সাথে আমিও ছিলাম। আর যে ছেলেটা ছিলো সে মাহিন। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি।
অনিকঃ ওয়াট। তুই ওই ছেলেটাকে ভালোবাসিস।
আফরিনঃ হ্যা ভাইয়া। আর সেটা ভাবি কিভাবে যেন জেনে যায়। পরশু রাতে আমাদের মাঝে ঝগড়া হয় আর ভাবি সেই ঝগড়া মিটাতে ওকে রেস্টুরেন্ট এ ডাকে। মাহিন আমাকে বিয়ে করতে চায় কিন্তু ভাবি তোমাকে না জানিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। তাই মাহিন কে বুঝাতে রেস্টুরেন্ট দেখা করা।
অনিকঃ আমি যখন ওখানে ছিলাম তখন তো তোকে দেখিনি। কোথায় ছিলি তুই?
আফরিনঃ কফি খেতে খেতে হঠাৎ হাত ফসকে কফিটা আমার ড্রেসে পড়ে যায়। সেটা ধুতে আমি ওয়াশরুম এ যাই। ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই দেখি মাহিন ভাবিকে পিছন থেকে ডাকছে। আর ভাবি কোনো কথা না শুনে পাগলের মতো ছুটে গেছে। পরে মাহিনকে জিজ্ঞেস করে সব টা জানলাম। তখন থেকে ভাবির ফোনে কল দিয়েই যাচ্ছি ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। তোর কি মনে হয় না তোর একটা ভুলের জন্য আজ ওকে হারাতে হলো। ভাবির কিছু হলে তার জন্য দায়ী থাকবি তুই ভাইয়া। শুধু তুই।
অনিক ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে। এতোদিন এ ওর কি তানুকে চিনতে কোথাও ভুল ছিলো। কোথায় খুঁজবে এখন ওকে। এদিকে রাত অনেক হয়েছে। সারাদিন মেয়েটা কোথায় কাটালো কিভাবে কাটালো এসব এসব ভাবতে ভাবতেই নিজের উপর রাগ টা বাড়তেই থাকে।
অনিক তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবে তখনই আফরিন ওকে বলে।
আফরিনঃ কোথায় যাচ্ছিস?
অনিকঃ ভুলটা শোধরাতে।
আফরিনঃ কোথায় খুঁজবি ভাবিকে এতো রাতে।
অনিকঃ আমি কিচ্ছু জানিনা শুধু এটাই জানি ওকে আমার চাই। যেভাবে হোক খুঁজে বের করতে হবে।
অনেকটা সময় খুঁজবার পর অনিক ব্যর্থ হয়ে গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে রাখে। মনে মনে নিজেকে হাজারো গালিগালাজ করছে।
কিভাবে পারলাম আমি ওকে ভুল বুঝতে। যে মেয়েটা আমার জন্য নিজেকে নতুন ভাবে বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ আমি কিনা তাকে আবারো বাধ্য করলাম সেই ভুলটা করতে যে ভুল একবছর আগে করতে যাচ্ছিলো।
বছর খানেক আগে অনিক যখন গাড়ি নিয়ে বাসায় ফিরছিলো তখন হঠাৎ ওর গাড়িটা তেল ফুরিয়ে যায়। মাঝরাস্তায় বসে বসে ভাবছে বাসায় যাবে কিভাবে? তখন কারো কান্নার আওয়াজ কানে আসে। চারিদিকে তাকিয়ে দেখে রাস্তায় পাশে একটা মেয়ে কান্না করছে। অনিক তার কাছে যাওয়ার আগেই মেয়েটা মাঝরাস্তায় চলে আসে। তখন উল্টো দিক থেকে একটা বাস ওকে ধাক্কা দিতে যাবে এমন সময় অনিক মেয়েটাকে একটা টান দিয়ে রাস্তায় কিনারায় গিয়ে পড়ে।
জানতে চাইলে মেয়েটা প্রথমে কিছুই বলে না।
অনেক জুর করে তারপর মেয়েটা বলা শুরু করে।
অনিকঃ দেখুন এতো রাতে কেউ তো আর এমনি এমনি মরতে আসে না। আপনার মরতে যাওয়ার ইচ্ছাটা জাগলো কেনো?
তানুঃ…………
অনিকঃ প্লিজ বলুন আমাকে আপনার বন্ধু ভাবতে পারেন আমি কোনো ক্ষতি করবো না।
তানুঃ………….
অনিকঃ বিশ্বাস রাখতে পারেন আমার উপর।
তানুঃ বিশ্বাস আর কতো বিশ্বাস করে ঠকবো। নিজেকে আর কতো ঠকাবো। পারছি না আর এই যন্ত্রণা সহ্য করতে। বাধ্য হয়ে মরার পথ বেচে নিলাম। কেনো বাচালেন আপনি আমাকে।
অনিকঃ আমাকে বুঝিয়ে না বললে বুঝবো কিভাবে?
তানুঃ জন্মের পরেই বাবা মা একটা এক্সিডেন্ট এ মারা যায়। মামা মামির কাছে মানুষ হলাম। সেই মামাই এখন সম্পত্তির জন্য তার গুন্ডা বদমাশ ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিতে চায়। অনেক বাধা দেই কাজ হয় না। বাধ্য হয়ে সব সম্পত্তি এতিমখানায় দান করি। পরিচিত বলতে নেহা নামে একটা ফ্রেন্ড আছে সে আজ দেশের বাইরে। নইলে ওর কাছেই যেতাম। মামা মামির কাছে গেলাম সম্পত্তি নেই বলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলো। যাওয়ার মতো আর কোনো আশ্রয় স্থল নেই। বাধ্য হয়ে নিজেকে শেষ করে দিতে…….
অনিকঃ হা হা হা। আপনি কি পাগল নাকি। এটা কোনো কারণ হলো মরার মতো।
তানুঃ শুধু এটা না।আরো একটা কারণ আছে।
অনিকঃ কি সেটা?(হাসি থামিয়ে)
তানুঃ আমার মতো অপয়া মেয়েকে কেউ বিয়ে করবে না। মামা মামি তো সম্পত্তির জন্য আমাকে ব্যবহার করে দুদিন পর রাস্তায় ফেলে দিতো। আর তারপরেও আমাকে এই মৃত্যুর আশ্রয় নিতে হতো।
অনিকঃ মরতে হবেই কেনো?
তানুঃ আমি কোনোদিন ও বেবি নিয়ে পারবো। এই একটা কারনে সবাই আমাকে অপয়া বলে। এই অপবাদ টা মেনে নেওয়ার মতো শক্তি ইচ্ছে আর আগ্রহ কিছুই আমার নেই।
অনিকঃ আপনি তো বড্ড বোকা। আজ কাল এটা কোনো কারণ না। বেবি হবে বেবি এডপ্ট নিলেই হয়। আর এটা কি আপনি ইচ্ছে করে করেছেন এটা বিধাতার স্বয়ং নিজে লিখে রেখেছেন তাই আপনার কপালে মাতৃত্ব এর সুখ নেই তাই বলে মা ডাক শুনতে পারবেন না এমন তো না। বিয়ের পর বেবি এডোপ্ট নিলেই হয়ে যাবে।
তানুঃ ঘর বাড়ি আত্মীয় স্বজন কেউ নেই। রাস্তায় পরে থাকা মেয়ে কে কে বিয়ে করবে।
অনিক ভাবনায় পরে যায়। অনেক ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নেয় যে সে তানুকে বিয়ে করবে। অনেক কষ্টে মুখ থেকে কথাটা বের করে অনিক।
অনিকঃ যদি বলি আমি। তাহলে কি ফিরিয়ে দিবেন আমাকে?
তানুঃ হি হি হি। হাসালেন আমাকে। দয়া দেখাচ্ছেন আমার উপর করুণা করছেন আমি কারো করুণা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।
অনিকঃ করুণা কেনো হবে মানুষ হিসেবে একটা মানুষ কে বাঁচাতে চাইছি। আর আপনার সেটা করুণা মনে হয়।
তানুঃ তা নয়তো কি? আর আপনি বললে কি হবে আপনার পরিবার। আপনার মা বাবা।
অনিকঃ আফরিন নামে একটা বোন ছাড়া কেউ নেই। আর আজ আপনি আমার সাথেই যাচ্ছেন।
তানুঃ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
অনিকঃ বিশ্বাস রাখতে পারো যতদিন না তুমি আমাকে মেনে নিবে ততদিন আমরা বিয়ে করবো না।
তানুঃ মানে মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আমি কোথায় থাকবো?
অনিকঃ গার্লস হোস্টেলে। আপনার সব দায়িত্ব আজ থেকে আমার আর হ্যা আমি জানি আমি ওতোটা খারাপ নই যে আমাকে মেনে নিতে খুব বেশি সময় লাগবে।
তানুঃ যে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দেয় তাকে অবিশ্বাস করাটা অন্যায়।
অনিকঃ তাহলে যাচ্ছেন আমার সাথে।
তানুঃ একটা শর্ত।
অনিকঃ কি?
তানুঃআমাকে তুমি করে বলবেন।
অনিকঃ ওকে মিস
তানুঃ তামান্না রাহাত তানু।
এইভাবেই অনিক আর তানুর পরিচয়। একটা সময় দুজনের ভালোলাগা তারপর ভালোবাসা আর অবশেষে বিয়ে। অনিকের ভাবনা থামে ফোনের রিংটোন এ।
অনিকঃ হ্যা নেহা বলো।
নেহাঃ বলবে তো তুমি ভাইয়া। এক্ষুণি আমার বাসায় আসো।
অনিকঃ এখন যেতে পারবো না নেহা একটা ভুল করে ফেলেছি যেভাবে হোক আজ এই ভুলটা শুধরাতে হবে।
নেহাঃ এভাবে মাঝরাস্তায় থাকলে জীবনেও শুধরাতে পারবে না।আমার বাসায় আসো তাড়াতাড়ি।
অনিকঃ তারমানে তানু ওখানে আছে।
নেহাঃ হ্যা আমার কাছে আছে।
অনিকঃ আমি এক্ষুণি আসছি।
অনিক একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয় তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে নেহার বাসার দিকে রওয়ানা দেয়।
কলিংবেল বাজাতেই নেহা দরজা খুলে দেয়।
অনিকঃ কোথায় তানু?
নেহাঃ আর কোথায় রুমে। সেই তখন থেকে কেঁদেই যাচ্ছে।
অনিকঃ আমি কেনো যে এমনটা করলাম? এখন নিজের চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে।
নেহাঃ সেটা তানু নিজেই ছিড়ে দিবে আগে ওর কাছে যাও।
অনিক তাড়াতাড়ি ভেতরে গিয়ে একটা রুমে ডুকে। ভেতরে ডুকে দেখে তানু বালিশে মাথা হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। এদিকে চোখের জল অবিরত ঝড়ছে। তানুর হাতের উপর ব্যান্ডেজ দেখে অনিকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। ভালো করে তাকিয়ে দেখে মাথায় ও একটা ব্যান্ডেজ। অনিক ওর পাশে গিয়ে বসে। তানুর একটা হাত নিজের হাতে নেয়। ব্যথার জায়গায় আলতো করে চুমু খায়। তানুর বুঝতে বাকি নেই এটা অনিক। অনিকের ছোঁয়া ভালো করেই অনুভব করতে পারে। চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। ঘুমের অভিনয় করে চোখ বন্ধ করে আছে। তানু চোখ খুলে তাকাচ্ছে না দেখে অনিক নিজেই মুখ খুলে।
অনিকঃ আমি জানি পাগলি তুমি ঘুমাওনি। শুধু শুধু ঘুমের অভিনয় কেনো করছো? তুমি খুব ভালো করেই জানো আমার বুকে মাথা না রেখে তুমি ঘুমাতে পারো না। তোমাকে বুকে না নিয়ে ঘুমালে আমার নিজেরও ঘুম আসে না।
তানুঃ……….
অনিকঃ তোমার অনিক তোমাকে ডাকছে তুমি শুনবে না তার কথা। মাথা রাখবে না তার বুকে। কি হলো তানু কিছু বলছো না কেনো? আমি জানি তুমি ঘুমাও নি। তুমি ঘুমের ভান ধরেই আছো। প্লিজ একবার তাকাও না।
তানুঃ…………
তানু কোনো সাড়া দিচ্ছে না। অনিক নিজে থেকেই তানুর মাথায় নিজের দুহাত রাখে। অনিকের হাতের ছোঁয়ায় ব্যথা লাগলেও চোখ তুলে তাকাচ্ছে না মেয়েটা। অনিক ওর মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে। অনিক জানে এখন আর কথা না বলে থাকতে পারবে না। খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।
অনিকঃ ভুল হয়ে গেছে আমার ক্ষমা করে দাও।
অনিক কথাটা বলা মাত্রই তানু নিজের দুহাত দিয়ে অনিককে আরো জুড়ে চেপে ধরে কান্নার বেগ বাড়িয়ে দেয়।
অনিকঃ আমি নিজেই তোমাকে বেঁচে থাকার জন্য সাহস যোগাই আর আমি কি না তোমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলাম। আমার একটা ভুলের জন্য কতো কষ্ট পেতে হলো তোমাকে। কিভাবে পারলাম আমি এমনটা করতে? কিভাবে তোমাকে ভুল বুঝলাম আমি? আমাকে ক্ষমা করে দেও তানু। আমি জানি আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। তোমাকে ওই ভাবে বলতে চাইনি। কি করবো বলো মাহিনকে ওখানে দেখে মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিলো। তোমাকে হারিয়ে ফেললে আমি বাঁচবো কিভাবে?
তানুঃ এইভাবে বলো না অনিক খুব কষ্ট হয়।
অনিকঃ ক্ষমা করে দাও।
তানুঃ আমার এই জীবনটা তো তোমারই দেওয়া অনিক। যদি সেদিন তুমি আমাকে না বাঁচাতে তাহলে আজ হয়তো আমি এইভাবে তোমার বুকে থাকতাম না।
অনিকঃ সেদিনের মতো ভুলটা আবার করতে চাইছিলে।
তানুঃ তুমি ছাড়া যে আমার কেউ নেই অনিক। সেই তুমি যখন আমাকে তোমার থেকে দূরে সরে যেতে বললে বিশ্বাস করো আমার মাথায় তখন শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছিলো নিজেকে শেষ করে দিবো। বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তুমি। আর আজ তোমার থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে এটা ভাবলেই মরে যেতে ইচ্ছে করে।
অনিকঃ আর কোনদিন ও এমন হবে না। এবারের মতো ক্ষমা করো।(তানুর দু গালে হাত রেখে)
তানুঃ একটা শর্তে ক্ষমা পাবে।
অনিকঃ বলো কি শর্ত সব মানতে রাজি।
এইবলে অনিক তানুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। তানু ওর মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর বলছে..
তানুঃ মাহিন আর আফরিনের বিয়েটা দিলে কেমন হয়? না মানে যদি তুমি রাজি থাকো তো আমি চাই আগামী মাসেই ওদের কে…..
অনিকের বড় বড় করে তাকিয়ে থাকা দেখে তানু ভয় পেয়ে ডোক গিলে। তারপর ভয়ে ভয়ে অনিকের দিকে তাকায়। অনিক ওর এই অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অনিকঃ এইভাবে তাকানোর কি আছে? আমি বাঘ ভাল্লুক কিছু না যে তোমাকে খেয়ে ফেলবো। আফরিন আমার থেকে বেশি তোমাকে ভালবাসে ভরসা করে আর আমি জানি তুমি ওর সাথে খারাপ কিছু হতে দিবে না। তুমি যেভাবে ওকে বুঝাচ্ছো এতে ও তোমার প্রতি আরো শ্রদ্ধাশীল হতে থাকে। আর তাই আমি চাই আফরিন এর জীবনের যত সিদ্ধান্ত সেটা তুমি আর আফরিন মিলে নিবে। আর ইচ্ছে হলে আমাকেও সাথে রাখতে পারো।
তানুঃ শয়তান,বানর,উল্লুক। আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম। কেউ এইভাবে তাকায়।
তানু ধুমধাম কিলঘুষি দিতে থাকে অনিকের বুকে। অনিক ওর হাতটা ধরে নেয়।
অনিকঃ বুকে ব্যথা দিচ্ছো কেনো? তুমি মাথা রাখবে কোথায় যদি বেশি ব্যথা লাগে।
তানুঃলাগবেনা। যত ব্যথা দেই তবুও তুমি আমারই।
তানু আলতো করে নিজের দুঠোট ছুঁইয়ে দিলো অনিকের বুকে। অনিক ওকে নিজের বুকে মিশিয়ে নিলো। দুজনেই যেন আজ ভালোবাসাকে নতুন ভাবে উপলব্ধি করছে।একে অপরের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে আজ অজানা খেয়ালে।
ভালো থাকুক ভালোবাসার মানুষ গুলো।ভালো রাখুক তাদের ভালোবাসাকে।

সমাপ্ত——।

Updated: October 20, 2020 — 6:48 pm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *