বাংলা ভালবাসার গল্প ২০২০ | Bangla Love Story 2020

গল্প :জোছনা বিলাস

আজকাল খেয়াল করছি, তিন-চার দিন পর পরই আমার
মানিব্যাগ থেকে টাকা চুরি হচ্ছে।রাতে মানিব্যাগে যত
টাকা রাখছি,পরের দিন তত টাকা পাচ্ছি নাহ। কখনও
পাঁচশ কম,তো কখনও সাতশ বা হাজার।
বাসায় আমি আর আমার বউ অলি ছাড়া কেউ থাকে না।
কাজের মেয়ে রান্না আর যাবতীয় কাজ করেই চলে যায়।
কাজের মেয়ের কোন সুযোগ নেই আমার মানিব্যাগে হাত
দেওয়ার। তো সন্দেহের তীরটা সম্পূর্ণ অলির দিকে যায়।
শেষ চুরি হয়েছিল তিন দিন আগে।এর মানে আজ বা কাল
আবার চুরি হবে। তো বউকে হাতে-নাতে ধরব ভাবলাম।
রাতে মানিব্যাগ যথা স্থানে রেখে দিলাম। কিন্তু
মানিব্যাগের সব টাকা বের করে অন্য জায়গায় লুকিয়ে
রাখলাম।আর মানিব্যাগে একটা চিরকুট রেখে দিলাম।
রাতে তারাতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আসলে
ঘুমানোর ভান করে পড়ে ছিলাম।বউও যথারীতি আমার
পাশে এসে শুয়ে পড়লো।
অনেক্ষণ পর খেয়াল করলাম অলি বিছানা থেকে নেমে
গেল।ডিম লাইট জ্বালানো ছিল। সেটার আলোতেই
দেখলাম বউ চুপিসারে আমার মানিব্যাগের দিকে
এগিয়ে যাচ্ছে।
আমিও চুপিচুপি নেমে সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে
দাঁড়ালাম।বউ মানিব্যাগ হাতে নিয়ে বুঝলো ওটা বেশ
হালকা হয়ে আছে আজ। টাকা বের করার জন্য মানিব্যাগ
খুলতেই টাকা তো পেল নাহ, পেল একটা চিরকুট।
ডিম লাইটের আলোতেই চিরকুটটা পড়ার চেষ্টা করছে বউ
আমার। ঠিক তখনই রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিলাম আমি।হ
ঠাৎ রুমের আলো জ্বলে উঠায় বউ প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছে।
চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত একটা
হাসি দিল।
আমি একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললাম,”ডিম লাইটের
আলোতে পড়তে অসুবিধা হচ্ছিল হয়তো।পড়ো এখন।
জোরে পড়বা।”
বউ পড়ল,”কিউট চুন্নী বউ আমার।” সে প্রচন্ড লজ্জা পেয়ে
বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল আবার।
এদিকে আমি অনেক কষ্টে হাসি চেপে আছি। কিছুক্ষণ
পর আমিও গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
সে এমনিতে বাঘিনী হলেও কিছুই বলল না এখন।আমিও
আর লজ্জা দিতে চাইলাম না।তাই ঐ বিষয়ে কিছুই
বলিনি পরে।
ঐ ঘটনার দুই দিন পর আমাদের বিবাহ বার্ষিকী আসে।
একদম ভোরে ঘুম থেকে উঠে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে
বিবাহ বার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানায় আমরা। এরপর
সকালের নাস্তা একসাথে বানায়। আমি টুকটাক সাহায্য
করছিলাম শুধু।অফিস থেকে ছুটি নিতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু জুটল না। নাস্তা সেরে অফিসে চলে গেলাম।
স্পেশাল কিছু করা হলো না তেমন। তবে অফিস থেকে
একটু আগেই ফিরেছি আজ।
আসার সময় ওর প্রিয় হলুদ-অর্কিট নিয়ে আসি।
বাসায় এসে দেখি বউ ভালোই আয়োজন করেছে।ড্রয়িং
রুমটা সাজিয়েছে কিছুটা। কয়েক পদের রান্না করেছে।
প্রিয় বিরিয়ানির দিকেই আগে চোখ গেল।
অলি ফ্রেস হয়ে আসার জন্য তাড়া দিল।ফ্রেস হয়ে এসে
দেখি অলি হাতে একটা গিফট বক্স নিয়ে বসে আছে।
কাছে যেতেই ওটা হাতে দিয়ে আবারো সকালের মতো
জড়িয়ে ধরে বিবাহ বার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানালো।
আমিও ওকে শুভেচ্ছা জানালাম,শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
কিছুক্ষণ জড়িয়ে রেখে ছেড়ে দিলাম। গিফটটা পাশেই
রেখে রুমের দিকে এগোলাম।
গতকাল ওর জন্য একটা নীল রঙের শাড়ি এনে
রেখেছিলাম। আমার চয়েস খারাপ নাহ। তবুও শাড়িটা
কিনতে এক মেয়ে কলিগের সাহায্য নিয়েছি।
শাড়ির প্যাকেটটা ওর হাতে দিতেই বলল,”এখন খুলি?”
আমি মুচকি হেসে বললাম,”খুলো।”
শাড়িটা দেখেই ওর চোখ ঝলমলে হয়ে উঠল। বুঝলাম
শাড়িটা ওর পছন্দ হয়েছে।ও বলল,”খুব সুন্দর হয়েছে।
থ্যাঙ্কিউ।”
“তাহলে এবার আমারটা খোলা যাক।”, বলে অলির দেওয়া
গিফট হাতে নিলাম। গিফট খুলে দেখলাম একটা ঘড়ির
বক্স।বক্সের ভেতরের ঘড়িটা দেখে আমি রীতিমত অবাক
হয়ে গেলাম।
আমার ঘড়িটা পুরোনো হয়ে গেছে, তাই কিছুদিন আগে
অনলাইনে কিছু ঘড়ি দেখছিলাম। দেখছিলাম শুধু,
কেনাটা পরের ব্যাপার। তখন অলি আমার পাশেই ছিল।
সেও তাকিয়ে ছিল আমার ফোনের স্ক্রিনের দিকে।
একটা ঘড়ি দেখে আমার খুব পছন্দ হলো।ডিটেলস
দেখছিলাম ঘড়িটার।দাম ছিল সাড়ে নয় হাজার। দাম
দেখে কেনার ইচ্ছাটা দপ করে নিভে গেল।
আপাতত হাতে বেশি টাকা নেয়। বেতন যা পাই, তা
থেকে গ্রামের বাড়িতে পাঠাই আর নিজের সংসার
চালায়।তাই সঞ্চয় খুব একটা হয় না। ঘড়ি কেনার ইচ্ছাটা
আপাতত দমিয়ে রাখলাম। ভাবলাম পুরোনো ঘড়িতেই
চালিয়ে নেব আরো কিছুদিন।
ফোনের স্ক্রিন অফ করে, ফোনটা রেখে চোখ বন্ধ করে
শুয়ে থাকলাম।হুট করে অলি বলল,”কি হলো? ফোন রেখে
দিলে যে?”
“ভালো লাগছে নাহ।”
“ঐ ঘড়িটা কিনে নাও। সুন্দর তো ঘড়িটা। তোমার হাতে
মানাবে খুব।”
“নাহ। ইচ্ছে করছে না।”
“মিথ্যা। বেশি দাম, তাই কিনতে চাইছো না।”
আমি চোখ খুলে ওর দিকে তাকালাম।না বললেও মাঝে
মাঝে ও অনেক কিছুই বুঝে যায়।
কিছুই বললাম না আমি।অলিও কিছু বলেনি আর।
ঐ ঘড়িটাই এখন দেখতে পাচ্ছি আমার হাতে। আমি অবাক
হয়ে তাকিয়ে আছি ওর দিকে।এত টাকা কোথায় পেল ও?
ও তো চাকরি করে না।ওর পরিবারের থেকেও নেবে
না,জানে আমি পছন্দ করি না এসব। তাহলে?
“এত টাকা কোথায় পেলে তুমি?”, ওকে প্রশ্ন করলাম
আমি।
“পেয়েছি কোথাও।”
“তোমার ভাইয়ার থেকে নিয়েছো? নাকি ধার নিয়েছো
কারো থেকে?”
“আন্দাজ করো দেখি।”,আমার বাহু জড়িয়ে ধরে বলল
অলি।
আমি ভেবে কিছুই না পেয়ে বললাম,”বুঝতে পারছি না
আমি। এখনই বলো আমাকে।”
ও মাথা নিচু করে বলল,”সেদিনের চিরকুটের কথা মনে
নেয়?”
ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকালাম আমি। হঠাৎ বিষয়টা বুঝতে
পেরে কিছুটা হেসে উঠলাম আমি।”বরের টাকা মেরে
বরকেই গিফট!কি ক্রিয়েটিভ আইডিয়া তোমার।”
“বরটা যে কিপটা হয়ে যাচ্ছে। সামান্য একটা ঘড়ি
কিনছে নাহ। পুরোনো ঘড়িতেই চালিয়ে নিতে চাচ্ছে
সারাজীবন। তাই এই ব্যবস্থা।”, বলে মুচকি হাসি দিলো
অলি।
“আরে সারা জীবন নাহ,আর কয়েকটা মাস পরেই কিনতাম
একটা ঘড়ি।”, কিছুটা হেসে বললাম আমি।
“হ্যা, জানি তো। কিন্তু এই কয়েকটা মাস যে ক’বছর পর
আসত, সেটা অজানা আমার।”
“তাই বলে এই নিষ্পাপ জামাইটার পকেট মারবা তুমি?”
“কোন অসুবিধা হয়েছে তোমার? তুমি কিনলে টাকাটা
একবারে লাগতো,তাই কিনো নাই। আমি সময় নিয়ে
হালকা হালকা করে জমিয়ে কিনে ফেললাম।”বিশ্ব জয়ী
হাসি দিয়ে বলল অলি।
“জমিয়ে? নাকি বরের পকেট কেটে?”, কিছুটা ব্যঙ্গ করে
বললাম আমি।
অলি কিছুটা কপট রাগ দেখিয়ে বলল,”আমার বরের পকেট
আমি কেটেছি, তাতে তোমার কি হে? নিজের বরের
পকেটই তো কেটেছি, পরের বরের পকেট তো নাহ। আর
তাছাড়া বরের পকেট কাটা প্রত্যেক বউয়ের বিয়েগত
অধিকার।সো, নো ফটর-ফটর।”
“ওহ! নতুন আইন হয়তো এটা। তাই জানিনা।”, কিছুটা হেসে
বললাম আমি।”তা কত নিলো এটা?সাড়ে নয় হাজারই?”
প্রশ্ন করলাম অলিকে।
“আরে নাহ,সপ থেকে নিয়েছি।আট হাজার নয়শ পঞ্চাশ
নিয়েছে।”
“ওহ! আচ্ছা।”
“দাও আমি পড়িয়ে দেয় তোমাকে”, বলে ঘড়িটা আমার
হাতে দিলো অলি।”বাহ, খুব সুন্দর লাগছে।”
“হুম।তা পুরোটাই আমার পকেট মেরে? নাকি তোমারও
ছিল কিছু?”
“আমার ছিল দেড় হাজার মতো।”
“কখন গেছিলা?আর কার সাথে?একা একা যাও নি
তো?”জিজ্ঞেস করলাম ওকে।
“আরে নাহ, বিথীকে নিয়ে গেছিলাম।”
“ওহ!”,বিথী ওর বান্ধবী।
“এখন চলো খেয়ে নেয়। খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
তোমার প্রিয় বিরিয়ানি রেঁধেছি আজকে।”বলে বাহু ধরে
টেনে তুলল আমাকে।
“আজ খাইয়ে দিবা আমাকে।”বললাম আমি।
“এহহ! পারব না আমি। বুড়ো মানুষ,এত ঢং কিসের?”,ব্যঙ্গ
করে বলল অলি।
“আমি বুড়ো!”, অবাক হয়ে বললাম আমি।”এখনও বাচ্চার
বাবা হলাম না।আর কিনা বুড়ো? যাও খাবো নাহ।”, বলে
বসে পড়লাম আবার।
“আচ্ছা।আর বলব না।আসো তারাতাড়ি।”
“খাইয়ে দিবা?”
“দিব দিব, আসো।বাচ্চা-বুড়ো কোথাকার।”
খাওয়া দাওয়া সেরে দুজনে ছাদে চলে গেলাম, উদ্দেশ্য
জোছনা বিলাস। ও আমার কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে।
খুব পছন্দের কাজ এটা ওর। হুট করে বলল,”একটা গান
শোনাও তো।”
“কোনটা?”
“এখন অনেক রাত”
শুরু করলাম আমি,”এখন অনেক রাত, তোমার কাঁধে আমার
নিঃশ্বাস, আমি বেঁচে আছি তোমার ভালোবাসায়…..”
গান শেষ করে জিজ্ঞেস করলাম,”কেমন লাগলো চুন্নী
বউ?”
ও আমার আমার পেটে জোরে একটা চিমটি দিয়ে
বলল,”আর একবার চু্ন্নী বললে খবর আছে তোমার।”
আমি চিমটি দেওয়া জায়গায় হাত বুলাতে বুলাতে মনে
মনে বললাম,”ওরে চুন্নী!দেখে নিব তোমায়।”
দূর আকাশে তারা গুলো মিটমিট করে জ্বলছে।কেউ হয়তো
আমাদের খুনসুটি দেখে মিটিমিটি হাসছেও। জীবনটা
সুন্দর লাগছে।চুন্নী বউটার জন্য নাকি? হয়তো।এমন আর
কয়েকটা বউ থাকলে মন্দ হতো না। জোছনা বিলাসটা
আরো মধুর হতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *