বাংলা নতুন ভালবাসার গল্প | Bangla New Love Story 2020

গল্প: ভালোবাসি

আমাদের নতুন বাসার ব্যালকনি থেকে আকাশ দেখা যায় না সেই কারনে আমার মন খুব খারাপ!

আশেপাশে গিজগিজ করছে বিল্ডিং। সকালে উঠেই চোখে পরে পাশের বিল্ডিং এর ব্যালকনির অদ্ভুত ছেলেটাকে। আমার দিকে তাকিয়ে কেমন মিটমিটিয়ে হাসে। আকাশ দেখা না গেলেও তার দিকে আমি কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকি। আমি তার নাম জানি না। সেও আমার পরিচয় জানে না। কোঁকড়া চুলের সুদর্শন ছেলেটাকে দেখতে দেখতে একসময় আমার ভালো লাগতে শুরু করে। কিন্তু কখনো বলা হয় না আমি তাকে কতোটা পছন্দ করি। ব্যালকনিতে তার দু’টো পোষা ময়না পাখি। দিন নেই রাত নেই কফির মগ হাতে আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে সে ময়না পাখির সাথে কথা বলে। মাঝেমধ্যে কানে হেডফোন গুঁজে দিয়ে মিউজিকের সাথে ড্যান্স করে। আমার তখন মনে হয়, ইশ! আমিও যদি তার মতো কথা বলতে পারতাম। তার মতো মিউজিকের সুর শুনতে পারতাম। কিন্তু কোনোদিনও কি তাকে বলা হবে? আমি যে জন্মগতভাবে বাক-শ্রবণপ্রতিবন্ধী! তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কখনো তার সামনে গিয়ে ‘ভালোবাসি’ কথাটা বলা হবে না। তার সাথে আমার হাতের এবং চোখের ইশারায় কথা শুরু হয়। আমি প্রায়ই রাতে তাকে নিয়ে স্বপ্নে দেখি, “তার সাথে আমি কোনো অদ্ভুত শহরে বসে আছি। যে শহরে আর কেউ নেই।”

দেখতে দেখতে পৌষ মাস চলে আসে। চারদিকে ফিনফিনে কুয়াশা। শরীরে কাঁপুনির সাথে সাথে ঠাণ্ডা বাতাস! সবুজ রঙের শালটা জড়িয়ে ব্যালকনিতে আসতেই কালো জ্যাকেট পরা ছেলেটা একটা কাগজ মুড়িয়ে আমার দিকে ছুড়ে দেয়। বলপেন দিয়ে সেখানে শুধু একটা শব্দই লেখা ‘ভালোবাসি’! সেদিন আর অপেক্ষা করিনি আমি রঙিন কাগজে রঙিন কলমে তার জন্য একই শব্দ লিখে রাখি। আমার লেখা ছোট চিরকুটে ছোট্ট মনের কথাটি তাকে আর বলা হয় না। জানি আর কোনোদিনও বলা হবে না। থাক না আমাদের ভালোবাসা এমনই হয়ে, আমি যে কারো করুণা হতে চাই না!

বুধবার সকালবেলা। আমরা বাসা পরিবর্তন করে অন্য একালায় যাচ্ছি। মা’কে ইশারায় বললাম, “আমার সব জিনিস গোছানো শেষ।”
ট্রাকে সব মালামাল তোলা হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে অদ্ভুত ছেলেটা অদ্ভুত এক কাণ্ড করে বসলো। সে ব্যালকনি থেকে একবার আমার দিকে তাকিয়েই দ্রুত চারতলার সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো৷ সবাইকে অবাক করে গভীর মমতা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে সে আমার হাত ধরলো। তার চোখে জল, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আছে। সে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বুঝালো, “যেও না! আমাকে ছেড়ে যেও না।”

আমার সমস্ত শরীর বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তার বাবা মা চলে এসেছেন। উনারা তাদের ছেলের এমন কাজে খুবই দুঃখপ্রকাশ করলেন। আমার বাবা মা’কে তারা কান্না জড়িত চোখে অনেক কিছু বলে ছেলেকে নিয়ে গেলেন। চলে যাওয়ার সময় পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের এক ছেলের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। এই দৃশ্য দেখার মতো নয়! তারপরও আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। আমি যে তাকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি!

মা আমার কাঁধে হাত রাখলেন এবং আমাকে ইশারায় যা বললেন তাতে আমি এতটাই বিস্মিত হলাম যে কিছুক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম। ছেলেটাও আমার মতো শুনতে পারে না, কথা বলতে পারে না! আমার বুঝতে বাকি রইল না যে, মিউজিক শোনা বা ময়না পাখির সাথে কথা বলা সবই সে আমাকে দেখানোর জন্য করেছে।

পাঁচ বছর পরের ঘটনা। দু’পরিবারের সম্মতিতেই আমাদের বিয়ে হয়। আমি এখন একটা টিভি চ্যানেলে শ্রবন প্রতিবন্ধীর নিউজ রিডার এবং সে সরকারী বাক-প্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষক। আমরা দু’জন একই ছাদের নিচে থেকে ছোট বাসার ব্যালকনিতে বসে একজন আরেকজনের হাতে হাত রাখি, কখনো জোছনা রাতে কাঁধে মাথা রেখে চাঁদ দেখি। মুখে হয়তো বলতে পারি না, কেউ কারো কথা শুনতে পারি না অথচ আমরা জানি, দু’জন দু’জনকে কতোটা ভালোবাসি! এখন আকাশ না দেখতে পারলেও আমার মন খারাপ হয় না। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হল, আমাদের তিন বছরের ছেলে ‘মাধুর্য’ সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় পৃথিবীতে এসেছে। বাইরের মানুষ হয়তো আমাদের দু’জনের দু’টি নাম রেখেছে। অথচ আমাদের কাছে আমাদের শুধু একটাই নাম ‘ভালোবাসি’!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *